Saturday, May 5, 2018

সতর্কবার্তা , রাম-কে : প্রবুদ্ধ বাগচী





                          সতর্কবার্তা , রাম-কে

গত শতকের  আটের দশকের শেষের দিকে ভারতের রাজনীতিতে দুটো কথা খুব চালু হয়েছিল --- মণ্ডল আর কমন্ডল । মণ্ডল অর্থে মণ্ডার রাজা বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং এর উদ্যোগে ( তখনও অনুপ্রেরণা কথাটা এমন সর্বজনীন হয়ে ওঠেনি) জাতপাতের সংরক্ষণ নিয়ে একটা রাজনীতির স্রোত যার পেছনে ছিল মণ্ডল কমিশনের রিপোর্ট । আর অন্যটা হল, কমণ্ডলু অর্থাৎ রাম নিয়ে রাজনীতি যাকে কৌতুক করে “রামনীতি” বললেও মন্দ হয় না। এর পেছনেও ছিল, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর একটি অদূরদর্শী পদক্ষেপ --- অযোধ্যায় রামলালা মন্দিরের দরজা খুলে দেওয়া । কার্যত এই প্যান্ডোরার বাক্স খোলা থেকেই আগামী পচিশ বছরের ভারতীয় রাজনীতির একটা ধারা বদলই হয়ে গেল বলা যায় । আর সেই ধারার সামনে চলে এলেন এক পুরাণপুরুষ – শ্রীরামচন্দ্র ।  সেই রাজনীতির মূল নিশান চলে এল ভারতীয় জনতা পার্টি বা ভাজপার হাতে, প্রয়াত উৎপল দত্ত যাদের ‘আদর’ করে ডাকতেন ভারতীয় জঞ্জাল পার্টি বলে । ঠিকই বলতেন, আজকে তো সেই জঞ্জাল প্রকান্ড একটা ভাগাড়ের চেহারা নিয়েছে যার বদগন্ধে আমাদের জীবন সংস্কৃতি সাহিত্য রাজনীতির টিকে থাকাই দায়।
রাম রাজনীতির সেই প্রবল উত্থানের সময়  আমাদের চারপাশে অনেক সব আনকোরা শব্দরা ঘুরে ফিরে বেড়াতে শুরু করে --- যেমন, আমরা প্রথম শুনলাম ‘কর সেবা’, ‘রামশিলা’ এইসব আধিভৌতিক শব্দ ; আমরা জানলাম ‘করসেবক’দের কথা, দেখলাম আদবানীজির ‘রামরথ’ কীভাবে গোটা দেশে দাঙ্গার উস্কানি দিতে দিতে এগিয়ে যাচ্ছে । আসলে আমাদের বাঙালি জীবনে এটা ছিল এক রকম যাকে বলে, প্যারাডাইম শিফট । কারন, রাম সীতা রাবণের কাহিনি আমরা ছেলেবেলা থেকে পড়লেও সেই পাঠ্যবই বা মা ঠাকুমার মুখের ঘুমপাড়ানি গল্পের নিরামিষ পরিসীমা ছেড়ে তা বেরোয়নি। আর আমাদের পরিচিত সাহিত্যে ও লোকজীবনে ‘রাম’ নামক বিশেষণটি ক্রমাগত ব্যবহার হয়ে এসেছে নেতিরই অর্থে --- তাই একেবারে হাবাগোবা নির্বুদ্ধি কাউকে আমরা ‘রামবোকা’ ( অথবা রামপাঁঠা )বলে আমোদ পেয়েছি, কিন্তু ঝকঝকে বুদ্ধিমানকে কোনোদিন ‘রাম বুদ্ধিমান’ বলে আখ্যায়িত করিনি, করতেও দেখিনি ।
 কিন্তু রাম রাজনীতির ওই বিরামহীন আগ্রাসনে আমাদের অনেক কিছুই গুলিয়ে যেতে লাগল । এমনকি ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে দেওয়ার কুৎসিততম অধ্যায়ের আগে যখন ‘রামসেবক’( নাকি ‘করসেবক’রা) জড়ো হচ্ছিলেন আমাদেরই পাড়ায় পাড়ায়, প্রতিবেশীর ঘরে তখন আমরা চোখ বড় বড় করেই দেখেছি, চেনা মুখগুলো, যারা দেশভাগ জনিত কারণে ছিন্নমূল হয়ে এপারে এসে প্রধানত বামপন্থী দলগুলির ছায়ায় নিজেদের থিতু করেছিলেন এবং বামফ্রন্টের মূল সমর্থনের গোড়া শক্ত করেছিলেন তারা হঠাৎই নিজেদের পাল্টে নিলেন বাম থেকে রামে । এখন তো সহজেই বোঝা যায় আসলে তফাত কেবল একটা ফুটকির, কিন্তু সেদিন প্রায় পচিশ বছর আগে এই ফুটকিটুকু নিজেদের গায়ে জড়িয়ে নেওয়ার মধ্যে একটা বিস্ময় ও আশঙ্কা ছিল ষোল আনা, আজ অবশ্য তা আর নেই । মোবাইল ফোনের সার্ভিস প্রোভাইডারের মতো এখন ফুটকি বা ঋ ফলা সব এদিক ওদিক করে নেওয়া যায় সহজেই --- শুধু দেখে নিতে হবে কে কেমন প্যাকেজ দিচ্ছে !
সেই আগ্রাসী সময়ে সদ্যপ্রয়াত অশোক মিত্র  যে সব লেখা লিখতেন তাতে বারবার তিনি মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন, আমাদের দেশে ক্রমশ এমন এক রাজনৈতিক দল নিজেদের পায়ের তলায় জমি বাড়িয়ে নিচ্ছে যারা এখনও পুরাণের যুগ পেরিয়ে আসতে পারেনি । এই পুরাণের যুগ কথাটা খুব দরকারি কথা । কারণ, এই সমস্ত রাজনীতির কাঠামোটার মধ্যে রয়েছে একটা পরিকল্পিত ভন্ডামি যার পেছনে আছে সাধারণ মানুষের ইতিহাসবোধকে তছনছ করে দেওয়ার একটা খেলা । ইতিহাসের খুব ভিতরে যদি নাই বা যাই, আমরা তো ছোটবেলা থেকেই জানি রামায়ণ ও মহাভারত আমাদের দুটি ক্লাসিক মহাকাব্য । দস্যু রত্নাকর কীভাবে একদিন কবি বাল্মীকি হয়ে উঠলেন তার কাহিনি আমাদের প্রাথমিক পাঠেই পড়তে হয় আর সেগুলো পড়তে গিয়ে আমরা যখন অবাক হয়ে দেখি যে বাল্মীকি তপস্যায় বসলেন এবং তাঁর শরীর ঘিরে তৈরি হয়ে গেল উইএর ঢিপি তখন আমাদের নাবালক বয়সের কল্পনার সঙ্গেই তা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। আমরা যুক্তির কষ্টিপাথরে কখনো বিচার করতে চাই না আদৌ এইরকমভাবে কোনও মানুষ দিনের পর দিন তপস্যায় থাকতে পারেন কি না, রাবণের রথ সীতাকে নিয়ে আকাশ দিয়ে উড়ে গেলেও আমরা ভাবি না এমন আবার হতে পারে নাকি ? ভাবি না রাবণের দশটি মাথার কথা, ভাবি না শূর্পণখা কীভাবে মানবী ( নাকি রাক্ষসী) থেকে হরিণ হতে পারে বা হনুমান একটা পাহাড় হাতে করে নিয়ে আসে কী প্রযুক্তিতে ? কোন শারীরবৃত্তীয় প্রকৌশলে কুম্ভকর্ণ ছমাস ঘুমিয়ে ছমাস জেগে থাকে ? সীতার পাতাল প্রবেশই বা হয় কী করে ? সত্যি বলতে, সীতার পাতাল প্রবেশের মূল কারণটা তো ছেলেবেলায় বুঝে উঠতেই পারিনি, বুঝেছি পরে ।
আসলে এইসব আপাত যুক্তিহীন কাহিনি ও ঘটনাগুলিকে ওইভাবে সত্যির সঙ্গে মেলাতে গেলে তার রসভঙ্গ হয় এটা অনুভব করেছি একটু পরিণত কালে। তাই ছেলেবেলার রূপকথার গল্পে যেসব মজাদার অথচ অবিশ্বাস্য ঘটনার দেদার উল্লেখ সেগুলোর সাথে প্রায় একসাথেই মিলে মিশে গেছে রামায়ণ  ও মহাভারতের আখ্যান তার কল্পজগতের অবাধ ডানামেলা খুশি নিয়েই। তাই আমরা যেমন লালকমল নীলকমল বা রাজকুমারী মণিমালার অস্তিত্ব নিয়ে কোনও বিপ্রতীপ ভাবনাকেই আমল দিইনি ঠিক তেমনই খুঁজে পেতে চাইনি তাদের জন্মভূমি কোথায় এবং কেমন ও কীভাবে ।  রাম ও রাবণের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নেই । ‘মেঘনাদ বধ’ কাব্য তো অনেক পরে পড়া, তার অনেক আগেই তো আমরা হেসে কুটোপাটি হয়েছি ‘লক্ষ্ণের শক্তিশেল’ পড়ে বা স্কুলের মঞ্চে অভিনয় করে---কিন্তু আমরা কোনোদিন খুব সিরিয়াস হয়ে গালে হাত দিয়ে ভাবতে বসিনি , এই রে, লক্ষণ বেচারাকে নিয়ে এইসব ফুক্কুড়ি করলে ‘রামায়ণ’ এর জাত যাবে না তো ? রাম নামক এক মহাকাব্যের নায়ক এত জরুরি আমাদের জীবনে যে তাকে নিয়ে কিছু বলা মানেই মহাপাতকের কাজ ? বরং আমরা ‘রাম’ এর একটা ছোট্ট ক্ষমতার কথা জানতাম --- রামনাম করলে নাকি ভুত পালায় ! যেহেতু তাদের খপ্পরে আমরা সেইভাবে কেউই পড়িনি ফলে এই সমীকরণ বা উপপাদ্য আমাদের আর যাচাই করে দেখা হয়নি।
কিন্তু, রামের নামে রাজনীতির খপ্পরে পড়ে আমাদের এইসব ধ্যানধারণা  ওলটপালট হয়ে যেতে থাকল ক্রমশ । যার প্রতিটি ধাপ আজও পর্যন্ত অভিসন্ধিময় ও বিষাক্ত । একটি উৎকৃষ্ট সাহিত্যের পরিণতি হল কিছু নির্বোধ ও ধর্মান্ধ পিশাচের ক্ষমতালাভের রক্তাক্ত সিঁড়িতে । তাছাড়া ‘রামায়ণ’ শুধু মহৎ কাব্য হিসেবেই নয় সামাজিক ও নৃতাত্ত্বিকভাবেও এই কাহিনির একটা প্রাসঙ্গিকতা আছে বইকি । প্রাচীন ভারতের আদিবাসী জনজাতিগুলির ওপর আর্য অধিপতিদের আধিপত্য স্থাপনের ঐতিহাসিক ঘটনাটি ধরে রেখেছে এই কাব্য । আর তার নির্মাণ ও বিস্তারও একেবারেই একমুখী নয় । যে উত্তরভারতে আর্‍্যরা প্রথম বসতি তৈরি করে তারাই নিজেদের ক্ষমতার বিস্তার ঘটাতে থাকে দক্ষিণে, আমাদের চেনা রামায়ণে সেই ইতিকথারই সমর্থন এবং এই রামায়ণ এর প্রথাগত কাহিনি  উত্তর ভারতের । তাই এই কাব্যেরই প্রতিস্প্রর্ধী কাহিনি নির্মাণ হয় দক্ষিণে এবং ‘রামায়ণ’ এর নানা ভাষ্য ছড়িয়ে পড়ে দেশ ও দেশের বাইরেও । একটি সাহিত্যিক দৃষ্টান্ত নিয়ে এমন বিচিত্র অভিজ্ঞতা সম্ভবত এর আগে আমরা দেখিনি। আর এই নানা ধরণের আঞ্চলিক সংস্করণে যে ফোকাস পয়েন্ট তা কিন্তু রাম-ই , কোথাও তিনি পূজ্য নায়ক, কোথাও তিনি খলনায়ক । কিন্তু এইসব বিস্তার ও তার ব্যাখ্যা অনেক অনেকদিন ধরে চলে আসছে । নবনীতা দেবসেন বিভিন্ন রামায়ণ এর টেক্সট নিয়ে শ্রমসাধ্য গবেষণা করেছেন, তাঁর কাছে জানা যায় সেইসব নানা রামায়ণের অলিগলির গল্প। কিন্তু এই কাব্যের বহুল ও বহুমাত্রিক আখ্যানকে মেনে নিয়ে ও আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির শরীরে তা মিশিয়ে নিলে আর নতুন কিছু থাকে না, থাকাটা সম্ভবও নয়।
কিন্তু এই না থাকাটার ফাঁকা জায়গাটাতেই রাম রাজনীতির বিষাক্ত চাষবাস । সহজ কথায় আমরা বুঝি একটি ভারতীয় মহাকাব্যের নায়ক পুরুষ ছাড়া রাম এর আর কোনও পরিচয় নেই । আর পাঁচটা গল্প কাহিনির মতো এটাও একটা আখ্যান। হতেই পারে যে সময় এই কাহিনি রচিত তার একটা  ইতিহাসগত বাস্তবতার ছায়া পড়েছে এই কাব্যে, পড়াটাই সংগত । অযোধ্যা নামে একটা জায়গা যেহেতু দেশের ভূগোলে আছে রাম চরিত্রটি সেখানে জন্মেছিলেন বলে গপ্পের খাতিরে ধরাই যায়। ঠিক যেমন রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ বেড়ে উঠেছিল কলকাতার এক পরিবারে, শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত ঘুরে বেড়িয়েছে ভাগলপুর থেকে বার্মায় , বিভূতিভূষণের অপু নিসচিন্দিপুরের ধুলোয় মাটিতে । আবার পাশাপাশি এও ঠিক যে গোরার কাহিনিতে যেমন আসতে পারে না দুর্গাপুর বা সল্টলেক ঠিক তেমনই রামকে আমরা রাজারহাটের শপিং মলে দেখবার প্রত্যাশা করি না এমনকি রামরাজাতলাতেও নয় । কিন্তু এই সাধারণ যুক্তিবোধকে মাটিতে আছড়ে ফেলে রাজনীতির ধান্দাবাজরা রামকে যেদিন এনে ফেললেন নিজেদের চর্চার মধ্যে তার ভিতর কোনও যুক্তি ছিল না, মনন বা ইতিহাস চেতনার তো কথাই ওঠে না । বলতে গেলে, রামের দুর্গতির সেই শুরু ।
এটা ঠিক যে, আমাদের দেশের সাধারণ হিন্দুদের মধ্যে বাল্মীকি রামায়নের থেকেও বেশি জনপ্রিয় তুলসিদাস এর ‘রামচরিত মানস’ ---- উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকায় অত্যন্ত ভক্তির সঙ্গে সেই কাহিনিকে গ্রহণ করা হয়েছে তাদের প্রতিদিনের জীবনযাপনে । সন্ধে হলে একটা নির্দিষ্ট এলাকায় জড়ো হওয়া মানুষরা বহুদিন ধরেই রাম-গান বা রামায়ন-পাঠ শুনতে যাচ্ছেন বা নিজেদের মতো করে রামের বিগ্রহ তৈরি করে পুজো করছেন এটা আমাদের জানা ও চেনা ছবি। এমনকি কলকাতা শহরেও অবাঙালি হিন্দিভাষী এলাকায় এই প্রথা আমরা দেখেছি--- রবিবারের পড়ে আসা বিকেলে শহিদ মিনারের নীচে গোল হয়ে বসে একদল ভিন প্রদেশের মানুষ ‘রামায়ণ-কথা’ শুনতে এসেছেন এ তো আমাদের খুব পরিচিত ছবি। এই মানুষগুলোর কাছে ‘রাম’ নিশ্চয়ই এক পরিত্রাতা ঈশ্বর কিন্তু তাঁরা ‘রাম’কে এর বাইরে ভোটবাজির কুস্তিতে দেখতে চাননি কোনোদিন , মাথাও ঘামাননি সেই রাম এর আঁতুড় ঘর কোথায় ছিল অথবা   সেখানে কোনও মসজিদ ছিল কি না এইসব কূট ও চালবাজ তর্কে । তাঁদের দিনানুদিনের জীবনের কষ্ট, যন্ত্রণা, অপ্রাপ্তি, স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের ভিতর তারা কেবল খুঁজে নেন এক ত্রাতা পুরুষকে যার অবলম্বনে হয়তো বা এগুলো পেরিয়ে যাওয়া যায় বলে তাঁদের সরল বিশ্বাস । এই সারল্যকে আহত করার কোনও অধিকার আমাদের নেই । বরং আমরা যারা নিজেদের একটু আধটু সাহিত্যকর্মের সঙ্গে জড়িয়ে রেখেছি তাঁদের একটা অপার বিস্ময় জাগাই বোধহয় বিধেয় যে , আমাদের শীলিত কবিতা বা কথাসাহিত্য যখন শীততাপ নিয়ন্ত্রিত সভাঘরের গুটিকয় চেনামুখের বাইরে এখনও বেরোতে পারল না সেখানে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে লেখা একটি কাব্য কীভাবে সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে গেছে ও নিয়ত তাঁদের জীবনযাপন ও জীবন সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে গেছে , কীভাবে সেই কাব্যের একটি বা দুটি চরিত্র হয়ে উঠেছে আরাধ্য, কীভাবে সেই কাব্য ছড়িয়ে পড়েছে প্রকান্ড এই দেশের অন্দরে অন্দরে,তাকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে  নানারকম টেক্সট সাবটেক্সট ! এই পরাজয় গর্বের বই কি !
আসলে এগুলো মানুষের একরকম বিশ্বাস । রামচন্দ্র ছিলেন কি ছিলেন না, ভরত তার পাদুকা মাথায় করে নিয়ে গিয়েছিলেন না যাননি এগুলো বিচার্য নয় কারণ একটি সাহিত্যিক আখ্যানে এই চরিত্রগুলি রচিত । সাহিত্য এতটাই পারে, পারে মানুষের মনের সহজাত কল্পনার সঙ্গে সাহিত্যের বাস্তব মিশিয়ে দিয়ে তাকে জীবন্ত ও বিশ্বাস্য করে তুলতে । কিন্তু ‘রামচন্দ্র’র এই চরম দুর্গতির দিনে এই বিশ্বাসই ফিরে এল এক অন্য চেহারায়। রাম মন্দির আন্দোলনের তুঙ্গ মুহূর্তে যখন পুরাতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞ রা বারবার বলবার চেষ্টা করেছেন , রাম একটি কাহিনির চরিত্র তার জন্মস্থান খোঁজা অনর্থক তখন লালকৃষ্ণ আদবানি বলেছিলেন রামচন্দ্র ওইখানে জন্মেছিলেন ( মানে ওই মসজিদের ভিতরে) এটা মানুষের বিশ্বাস ! বিশ্বাস ? বিশ্বাসের কি কোনও অবয়ব থাকে? থাকে নাকি যুক্তির কোনও পোক্ত কাঠামো ? অথচ ক্রমাগত এই ‘বিশ্বাস’ এর ভিত্তিতেই ছড়িয়ে দেওয়া হল উত্তেজনা, ধবংসের হিস্টিরিয়া --- যে চরিত্রের কোনও ঐতিহাসিক অস্তিত্বই নেই তার জন্মস্থানে মন্দির বানানোর হিড়িকে গুঁড়িয়ে দেওয়া হল ঐতিহাসিক সৌধ । আমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম ‘বিশ্বাস’ এতটাই পারে যদি তাতে বিষাক্ত পালের হাওয়া লাগানো যায়, তারপর ধরিয়ে দেওয়া যায় আগুন ---- তখন সেই আগুন দাবানল হয়ে খাক করে দেয় জীবন- সংস্কৃতি – ঐতিহ্য ।
সেই আগুন এখনও জ্বলছে । এখন রামচন্দ্র কারোর বাড়ির ফ্রিজে উঁকি মেরে দেখছেন তাতে কী মাংস আছে, দেখছেন তার বিরুদ্ধে কেউ কিছু বলছে কি না বললেই তার দিকে নিক্ষিপ্ত হবে তির, খুঁজে বেড়াচ্ছেন কোন দলিত উচু গলায় কথা বলতে চায় কি না, এমনকি তার নামে কোনও কিশোরীকে যৌন নিগ্রহ করা হলেও তিনি আগে জেনে নিচ্ছেন অপরাধী ও আক্রান্তের ধর্মপরিচয়, সারা দেশের মানুষকে তিনি ইতিমধ্যেই ভাগ করে ফেলেছেন দুটি শিবিরে--- হয় তিনি রামের অনুগত নয়তো তার বিরোধী । এখন আর আর প্রজাদের কথা শোনবার সময় নেই, তার মাথার ভিতর এখন আগ্রাসনের উল্লাস, দখলদারির আফিম আর আত্মপ্রচারের প্রকান্ড আয়োজন। সাহিত্যের উঠোন ছেড়ে বেরিয়ে রামচন্দ্র আপনি এখন এক শার্দূলনায়ক সদ্য শিকারের পর আপনার মুখে জিভে লেগে রয়েছে লোভের রুধির, আপনার মুখে ধরা পড়ছে এক হৃদয়হীন নিষ্ঠুরতার ইশারা ।
বাল্মীকির গপ্পে আপনি রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জিততে অপারগ ছিলেন যদি না নৈতিকতার বাইরে গিয়ে ইন্দ্রজিতকে বধ করা হত। ওইখান থেকেই তো আপনার নীতিনিষ্ঠ আদলটায় দগদগে খুঁত করে দিয়েছেন আপনার স্রষ্টা । সেইখান থেকেই আপনার একটু একটু করে পতনের সিঁড়ি তৈরি , আপনি নিজেরই অজান্তে আজ রাজনীতির চাপে নেমে এসেছেন আরো অতলান্তে । এখন আপনাকে সব থেকে আগে লড়াই করতে হবে নিজেরই বিরুদ্ধে !  যত তাড়াতাড়ি পারেন তা আরম্ভ করুন, নয় তো আমরা আপনাকে ভুলে যাব, যেতে বাধ্য হব।



1 comment:

  1. Sujata Basu ChattopadhyayMay 6, 2018 at 10:57 AM

    অনবদ্য বিশ্লেষণ|ভাষা ব্যবহারের সাবলীল গতি অতি সাম্প্রতিক ও অতি প্রাসঙ্গিক বিষয়ক রচনাটিকে অতীব সুখপাঠ্য করেছে|

    ReplyDelete

দেবমাল্য চক্রবর্তী

মা নিষাদ   ‘শয়তান, তুই নরকে যাবি পাপ-পুণ্যের জ্ঞান নেই তোর, শয়তান, তুই নির্ঘাৎ নরকে যাবি অভিশাপ দিচ্ছি তোকে, তুই নরকে যাবি’ দস্য...

ক্লিক করুন। পড়ান।